অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম যদি আপনি একবার ভালোভাবে বুঝতে
পারেন, তাহলে আর কখনো ট্যাক্স অফিসের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে হবে
না। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন যারা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়
এলেই একটু নার্ভাস হয়ে পড়েন। কাগজপত্র কোথায় রাখলাম, হিসাব মিলছে না, অফিসে
গেলে কর্মকর্তা কি বলবেন– এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা লেগেই থাকে। আবার অনেকে দালালের
পেছনে অকারণে সময় ও টাকা খরচ করেন অথচ নিজেই কাজটা সহজেই করতে পারতেন।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে।বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
বা NBR একটি অনলাইন প্লাটফর্ম চালু করেছে, যেটা ব্যবহার করে যেকোনো করদাতা নিজেই
ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ঘরে বসে
খুব সহজেই কাজটি সম্পন্ন করা যায়। রাতের বেলা অফিস থেকে ফিরে, এমনকি ছুটির দিনেও
এ কাজটি করা যাবে। কোনো দালাল লাগবে না, কোনো অফিসে যেতে হবে না, কোনো লাইনেও
দাঁড়াতে হবে না।এই আর্টিকেলে আমরা পুরো বিষয়টা একদম সহজভাবে উল্লেখ করার চেষ্টা
করবো।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো আর্টিকেলটা পড়ুন, আশা করছি আপনি অনেক উপকৃত
হবেন।
পেইজ সূচিপত্রঃ অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম– কাদের জন্য প্রয়োজ্য?
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম বোঝার আগে একটু জেনে নেওয়া দরকার–
আসলে কাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। অনেকেই মনে করেন শুধু বড় ব্যবসায়ী বা
উচ্চ আয়ের মানুষদেরই ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতায় একটু ভিন্ন।
বাংলাদেশে যাদের আয় নির্দিষ্ট সীমার ওপরে, তাদের প্রত্যেককেই প্রতিবছর আয়কর
রিটার্ন দাখিল করতে হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় না থাকলেও শূন্য রিটার্ন
জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এই বিষয়টি অনেকেই জানেন না এবং পরে বিভিন্ন
ঝামেলায় পড়েন।
যাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবেঃ
পুরুষ করদাতা যাদের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি।
নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি যাদের বার্ষিক আয় ৪ লাখ টাকার
বেশি।
প্রতিবন্ধী করদাতা যাদের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি।
সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী ব্যক্তি।
ডাক্তার, আইনজীবী ইঞ্জিনিয়ার বা স্বনিযুক্ত পেশাজীবি।
যাদের ব্যাংক একাউন্টে বছরে মোট জমার পরিমাণ ৩০ লাখ টাকার বেশি।
যারা গাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক।
ব্যবসা বা অংশীদারিত্ব ব্যবসার মালিক।
যারা কোনো কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার।
যারা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী।
একটু বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো ক্লিয়ার হবে। ধরুন,আরিফ সাহেব একটি
বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং তার মাসিক বেতন ৩৮ হাজার টাকা। বছরে তার মোট
আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই অবস্থায় তাকে অবশ্যই প্রতিবছর আয়কর
রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
আবার ধরুন, নাফিসা বেগম একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন এবং তার মাসিক বেতন
২২ হাজার টাকা। বার্ষিক আয় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। নারী করদাতার করমুক্ত সীমা ৪
লাখ টাকা হওয়ায় তার কর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তার TIN থাকলে এবং চাকরি করলে
শূণ্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
আয়কর রিটার্ন দাখিল করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটা একটা দেশের সচেতন
নাগরিকদের পবিত্র দায়িত্ব।
আয়কর রিটার্ন দাখিলের আগে যা যা গুছিয়ে নেবেন
আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে বসার আগে কিছু কাগজপত্র আর তথ্য হাতের কাছে না রাখলে
মাঝপথে আটকে যেতে পারেন। এটা অনেকটা রান্না করার আগে সব উপকরণ বের করে রাখার মতো।
আগে থেকে সবকিছু প্রস্তুত থাকলে কাজ অনেক দ্রুত এবং ঝামেলা মুক্ত হয়। অনেকেই
ফর্ম পূরণ শুরু করে মাঝপথে থেমে যান কারণ হঠাৎ দেখেন কোনো একটা তথ্য হাতের কাছে
নেই। তখন যে বিরক্তির সৃষ্টি হয় আগে থেকেই সব কিছু প্রস্তুত রাখলে সেই বিরক্তি
এড়ানো যায়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যঃ
TIN(Taxpayer Identification Number ) সার্টিফিকেট– এটা সবার আগে দরকার।
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)– আপনার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য।
বেতন সনদ বা বেতন স্লিপ– চাকরিজীবীদের জন্য পুরো অর্থবছরের।
ব্যাংক স্টেটমেন্ট– সব ব্যাংক একাউন্টের বার্ষিক বিবরণী।
বাড়ি ভাড়ার রশিদ – যদি ভাড়া আয় থাকে।
সঞ্চয়পত্র বা FDR– এর সার্টিফিকেট এবং মুনাফার বিবরণী।
জীবন বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধের রশিদ।
শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডের বার্ষিক বিবরণী।
ব্যবসায়িক আয়ের হিসাব– ব্যবসায়ীদের জন্য।
ডিপিএস বা আরডিএস এর বিবরণী।
মোবাইল নম্বর – OTP যাচাইয়ের জন্য।
একটা ছোট্ট পরামর্শ হলো, প্রতিবছর এই কাগজগুলো একটি আলাদা ফোল্ডারে রাখুন।
কাগজের ফটোকপি এবং ডিজিটাল কপি দুটোই রাখুন। মোবাইলে বা গুগল ড্রাইভে ছবি তুলে
রাখলে পরবর্তী বছরগুলোতে আর কিছু খুঁজতে হবে না।
আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য সবচেয়ে আগে যেটা দরকার হয় সেটা হচ্ছে TIN নম্বর।
যাদের এখনো TIN নেই, তাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। এটা নেওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে
গেছে এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনলাইনে করা যায়। আগে TIN নিতে হলে ট্যাক্স অফিসে
যেতে হতো, লাইনে দাঁড়াতে হতো এবং অনেক সময় লেগে যেত। এইসব ঝামেলা বর্তমানে আর
নেই।
আপনার এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ এবং মোবাইল নম্বরটি দিন।
মোবাইলে আসা ওটিপি(OTP) দিয়ে নিজের পরিচয় যাচাই করুন।
ঠিকানা, পেশা এবং অন্যান্য তথ্য পূরণ করুন।
সাবমিট করলেই সঙ্গে সঙ্গে টিআইএন(TIN) সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন।
পুরো কাজটা সম্পন্ন করতে মূলত 10 থেকে 15 মিনিটের মতো সময় লাগে। কোন অফিসে
যেতে হবে না এমনকি কাউকে কোনো প্রকার কোনো টাকাও দিতে হবে না।TIN সার্টিফিকেট
ডাউনলোড করে রাখুন এবং প্রিন্ট করে ফাইলে সংরক্ষণ করুন।
ই-রিটার্ন দাখিল করার পদ্ধতি– ধাপে ধাপে পুরো গাইড।
এবারে আমরা মূল কাজটি শুরু করতে যাচ্ছি। ই-রিটার্ন দাখিল করার পদ্ধতি অনেকের কাছে
প্রথমে জটিল মনে হয়,কিন্তু একবার করলেই দেখবেন এটা আসলে বেশ সহজ। নিচে ধাপে ধাপে
পুরো বিষয়টা আমরা জানবো।
ধাপ ১– পোর্টালে নিবন্ধন ও লগইন
NBR- এর অনলাইন রিটার্ন পোর্টাল
etaxnbr.govt.bd তে প্রবেশ করুন। প্রথমবার
ব্যবহারকারীদের জন্য নিবন্ধন করতে হবে। TIN নম্বর এবং মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি
পাসওয়ার্ড সেট করুন। পাসওয়ার্ডটি এমন রাখুন যা সহজে মনে থাকে কিন্তু অন্য কেউ
অনুমান করতে না পারে। পরবর্তী বার থেকে শুধু TIN এবং পাসওয়ার্ড দিয়েই লগইন করতে
পারবেন।
ধাপ ২– রিটার্ন ফর্ম বেছে নিন
লগইনের পর ড্যাশবোর্ড থেকে “রিটার্ন দাখিল করুন” অপশন বেছে নিন। সিস্টেম আপনার
পেশা ও তথ্য দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক ফর্ম সাজেস্ট করবে। সাধারণত চাকরিজীবীদের
জন্য IT-11GA ফর্ম এবং ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা ফর্ম থাকে। যদি সিস্টেমের সাজেস্ট
করা ফর্ম নিয়ে সন্দেহ থাকে তাহলে কর অফিসে একবার জেনে নিন।
ধাপ ৩– আয়ের তথ্য পূরণ করুন
এই অংশে আপনার সব ধরনের আয়ের তথ্য দিতে হবে। কোন কিছু বাদ দেওয়া যাবে না কারণ
NBR বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে। আয়ের উৎসগুলো হতে হবে —
চাকরির মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা (বাড়িভাড়া ভাতা চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত
ভাতা)
বোনাস ও উৎসব ভাতা
বাড়ি ভাড়া থেকে আয়— যদি বাড়ি বা ফ্লাট ভাড়া দেওয়া থাকে
ব্যবসা বা পেশা সাথে থেকে আয়
ব্যাংকের সুদ বা মুনাফা
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা
শেয়ার বা বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ
কৃষি থেকে আয় (যদি থাকে)
ফ্রিল্যান্সিং বা অন্য যেকোনো উৎস থেকে আয়
প্রতিটি উৎসের জন্য আলাদা আলাদা তথ্য দিতে হয়। বেতন সনদে যে পরিমাণ লেখা আছে
ঠিক সেটাই দিবেন।
ধাপ ৪– সম্পদ ও দায়ের তথ্য দিন
এই অংশে আপনার মত সম্পদ এবং দায়ের তালিকা দিতে হবে। যেমন জমি, বাড়ি, গাড়ি,
ব্যাংক ব্যালেন্স, আসবাবপত্র ইত্যাদি সম্পদের বাজার মূল্য লিখতে হবে। পাশাপাশি
ব্যাংক লোন বা অন্য কোন দায় থাকলে সেটাও উল্লেখ করতে হবে। এই তথ্য দেখলে
অনেকেই একটু ঘাবড়ে যান কিন্তু সব সত্য তথ্য দিলে কোনো সমস্যাই নেই।
ধাপ ৫– বিনিয়োগ ও কর ছাড়ের তথ্য দিন
এই ধাপটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে সঠিক তথ্য দিলে আপনার করের পরিমাণ
উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অনেকেই এই অংশটা ঠিকমতো পূরণ না করাই বেশি কর
দিয়ে দেন। বিনিয়োগ রিবেটের জন্য যোগ্য খাতগুলো হলো—
সঞ্চয়পত্র ক্রয়
জীবনবীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ
ডিপিএস বা এফডিআর
প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ
মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ
যাকাত প্রদান
সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন তহবিলে দান
একটা বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি সেটা লক্ষ্য করুন, ধরুন সালমা বেগমের বার্ষিক
করযোগ্য আয় ৬ লাখ টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তার কর আসে প্রায় ১০ হাজার টাকা
কিন্তু তিনি যদি ১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন এবং ১২ হাজার টাকার
জীবনবীমার প্রিমিয়াম দিয়ে থাকেন, তাহলে বিনিয়োগ রিবেট পেয়ে তার করের
পরিমাণ অনেকটা কমে আসবে বা শূন্যে নেমে আসতে পারে।
ধাপ ৬– কর পরিশোধ করুন
হিসাব শেষে যদি কর দেওয়ার থাকে, তাহলে অনলাইনেই পেমেন্ট করতে পারবেন। বিকাশ,
নগদ, রকেট বা যেকোনো ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে পেমেন্ট করা
যায়। ট্রেকিং নম্বর বা ট্রানজেকশন নম্বর সংরক্ষণ করুন পরে কাজে লাগবে।
ধাপ ৭– সাবমিট করুন এবং রশিদ সংরক্ষণ করুন
সব তথ্য একবার মনোযোগ দিয়ে চেক করুন। কোনো ভুল না থাকলে সাবমিট বাটনে ক্লিক
করুন। সফলভাবে সাবমিট হলে একটি ডিজিটাল স্বীকৃতি রশিদ বা acknowledgement slip
পাবেন। এটা ডাউনলোড করে রাখুন এবং প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করুন। ভবিষ্যতে
ব্যাংক লোন, পাসপোর্ট নবায়ন বা বিদেশে ভিসা আবেদনের সময় এই রশিদ অনেক কাজে
লাগতে পারে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম– করের হিসাব কিভাবে হয়
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম পুরোপুরি বুঝতে হলে করের হিসাবটাও
একটু জানা দরকার। বাংলাদেশে আয়করের হার আয়ের পরিমাণ অনুযায়ী ধাপে ধাপে
বাড়ে, একে বলা হয় প্রগতিশীল কর বা স্ল্যাব রেট। মানে আপনার আয় যতো বেশি করের
হারও তত বেশি হবে। তবে পুরো আয়ের ওপর এক রেটে কর হয় না—প্রতিটি ধাপের
জন্য আলাদা হার প্রযোজ্য।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সর্বশেষ কর স্ল্যাব অনুযায়ী হার পরিবর্তন হতে পারে।
তাই রিটার্ন দাখিলের আগে অবশ্যই NBR এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ আপডেট
দেখে নিন।
নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়স্কদের জন্য করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা এবং
প্রতিবন্ধী করদাতার জন্য ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
হিসাবের বাস্তব উদাহরণঃ রহিম সাহেবের বার্ষিক আয় ৮ লক্ষ টাকা। তার কর
হিসাব হবে—
প্রথম ৩ লাখ ৫০ হাজার — শূন্য কর
পরবর্তী ১ লাখ — ৫%= ৫,০০০ টাকা
পরবর্তী ৩ লাখ ৫০ হাজার—১০%= ৩৫,০০০টাকা
মোট কর= ৪০,০০০ টাকা
এরপর বিনিয়োগ রিবেট বাদ দেওয়া হলে চূড়ান্ত কর আরও কম হতে পারে।
প্রতিবছর অনেক করদাতা রিটার্ন দাখিলের সময় কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন।
যার কারনে পরে নানা ঝামেলা ও জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়। একটু সচেতন থাকলে এই
ভুলগুলো সহজেই এড়ানো যায়।
ভুল ১– আয় কম দেখানোঃ অনেকেই ভাবেন, কিছু আয় না দেখালে হয়তো কর কম আসবে।
কিন্তু NBR ব্যাংক নিয়োগ কর্তা এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য
যাচাই করে। ধরা পড়লে মূল করের দ্বিগুণ জরিমানা এবং আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে
হবে। তাই সব আয় সৎভাবে দেখানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
ভুল ২– শেষ মুহূর্তে দাখিল করাঃ প্রতিবছর ৩০ নভেম্বর রিটার্ন দাখিলের শেষ
তারিখ। অনেকেই এই তারিখের মাত্র কয়েকদিন আগে থেকে তাড়াহুড়ো করে কাজ শুরু
করেন। তখন পোর্টালে অনেক চাপ থাকে, কাগজপত্র গোছানোর সময় পাওয়া যায় না এবং
ভুলেও বেশি হয়। তাই অক্টোবর মাস থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ভুল ৩– বিনিয়োগের কাগজ না রাখাঃ বিনিয়োগ রিবেট পেতে হলে সঞ্চয়পত্র,
বিমার প্রিমিয়াম বা ডিপিএস এর প্রমাণপত্র লাগবে। অনেকেই বছরের শুরুতে বিনিয়োগ
করে কাগজ হারিয়ে ফেলেন এবং পরে রিবেট নিতে পারেন না। তাই প্রতিটি বিনিয়োগের
কাগজ পূর্বে থেকেই ফাইলে বা ডিজিটালি সংরক্ষণ করুন।
ভুল ৪– শূন্য রিটার্ন না দেওয়াঃ যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের অনেকেই মনে করেন
রিটার্ন দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু TIN থাকলে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে
শূন্য রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক, না দিলে সরকারি সেবাই সমস্যায় পড়তে
পারেন।
ভুল ৫– ভুল ফর্ম পূরণ করাঃ চাকরিজীবী আর ব্যবসায়ীর জন্য আলাদা আলাদা
ফর্ম থাকে। ভুল ফর্ম পূরণ করলে রিটার্ন বাতিল হয়ে যেতে পারে এবং নতুন করে জমা
দিতে হয়।
ভুল ৬– রশিদ সংরক্ষণ না করাঃ দাখিল করার পর অনেকেই রশিদ ডাউনলোড করেন না বা
সংরক্ষণ করেন না। কিন্তু এই রশিদ পরে ব্যাংক লোন, পাসপোর্ট বা ভিসার জন্য অনেক
কাজে আসে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম–বিশেষ পরিস্থিতিতে কি করবেন
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়মের পাশাপাশি কিছু বিশেষ
পরিস্থিতির জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। সবার পরিবেশ-পরিস্থিতি এক রকম নয় এজন্য
বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরী।
প্রবাসীদের ক্ষেত্রেঃ বিদেশে থাকলেও যদি দেশে সম্পদ বা আয় থাকে, তাহলে রিটার্ন
দাখিল করতে হবে।ভালো খবর হলো, বিদেশ থেকেই অনলাইনে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা
যায়। শুধুমাত্র মোবাইল বা কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই হয়।
নতুন চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেঃ যারা এই বছর প্রথমবার চাকরিতে ঢুকেছেন এবং
আয়করযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছেন তাদেরও রিটার্ন দাখিল করতে হবে। প্রথমবার
একটু কঠিন মনে হতে পারে কিন্তু একবার করলেই সকল প্রক্রিয়া বোঝা
যাবে।
ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রেঃ যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন এবং বৈদেশিক মুদ্রায় আয়
করেন তাদের জন্য আলাদা নিয়ম রয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে আনা রেমিটেন্সে
আয়কর অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ আছে। তাই একজন কর পরামর্শদাতার সাথে আলোচনা
করে নেওয়া ভালো।
যৌথ সম্পদের ক্ষেত্রেঃ স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই যদি আলাদা আলাদা আয় থাকে তাহলে
তাদের আলাদা আলাদা রিটার্ন দাখিল করতে হবে। একজনের রিটার্নে অন্যজনের আয়
যোগ করা যাবে না।
অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেঃ ৬৫ বছরের বেশি বয়স্কদের করমুক্ত সীমা বেশি তাই তাদের
কর তুলনামূলক কম হয়। পেনশন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বা ভাড়া আয় থাকলে সেটা
হিসাবে ধরতে হবে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্নের সুবিধাগুলো জানলে অবাক হবেন
অনেকেই এখনো পুরনো পদ্ধতিতে ট্যাক্স অফিস গিয়ে কাগজে রিটার্ন জমা দেন। কিন্তু
অনলাইন পদ্ধতিতে যেসব সুবিধা আছে সেগুলো জানলে আর পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে
চাইবেন না।
সময় ও খরচ বাঁচেঃ ট্যাক্স অফিসে যাওয়া আসা, লাইনে দাঁড়ানো, এইসবে যে সময় ও
পরিবহন খরচ হতো সেটা পুরোটাই বেঁচে যায়। একজন ব্যস্ত মানুষের জন্য এটা অনেক বড়
পাওয়া।
হিসাবে ভুল কম হয়ঃ অনলাইন পোর্টাল নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর হিসাব করে দেয়।
ম্যানুয়ালি হিসাব করলে যে ভুলের সুযোগ থাকে সেটা এখানে অনেক কম।
যেকোনো সময় যেকোনো জায়গা থেকে করা যায়ঃ রাত বারোটায় মনে পড়লো
রিটার্ন নেওয়া হয়নি? সমস্যা নেই।
ঘরে বসেই করে ফেলতে পারবেন খুব সহজেই।অফিস সময়ের অপেক্ষা করতে হবে না।
তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়ঃ সাবমিট করার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল রশিদ পেয়ে
যাবেন। কাগজের রশিদের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
পুরনো রিটার্ন এর তথ্য সংরক্ষিত থাকেঃ আগের বছরগুলোর তথ্য পোর্টালেই থাকে, যেটা
পরের বছর রিটার্ন পূরণের সময় অনেক কাজে লাগে। বারবার একই তথ্য দিতে হয়
না।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১ঃ রিটার্ন দাখিল না করলে কি হবে?
উঃ নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন দিলে প্রতিমাসে মূল করের ২% হারে বিলম্ব সুদ
দিতে হবে।এর বাইরে আইন অনুযায়ী আলাদা জরিমানাও হতে পারে। বারবার না দিলে
আইনে ব্যবস্থার মুখেও পড়তে হতে পারে।
প্রশ্ন ২ঃ একবার সাবমিট করার পর ভুল ধরা পড়লে কি করব?
উঃ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনী রিটার্ন দাখিল করা যায়। পোর্টালে এই অপশন
আছে তবে সংশোধনীতেও সঠিক তথ্য দিতে হবে।
প্রশ্ন ৩ঃ বেশি কর কেটে নেওয়া হলে ফেরত পাব কিভাবে?
উঃ অফিস থেকে বেতনের ওপর বেশি কর কেটে নেওয়া হলে রিটার্নে সেটা দেখালে অবশ্যই
রিফান্ডযোগ্য বলে গণ্য হবে।
প্রশ্ন ৪ঃ মোবাইল দিয়ে কি রিটার্ন দাখিল করা যায়?
উঃ হ্যাঁ দাখিল করা যায়, স্মার্টফোনের ব্রাউজার দিয়ে পোর্টালে ঢুকে রিটার্ন
দাখিল করা সম্ভব। তবে কম্পিউটার বা ট্যাবলেটে করলে বেশি সুবিধাজনক হয়। প্রশ্ন
৫ঃ সাহায্যের দরকার হলে কোথায় যোগাযোগ করব?
উঃ NBR এর হেল্পলাইন নম্বর ১৬৫৫৫ এ কল করতে পারবেন। এছাড়া নিকটতম কর অফিসে
গিয়েও সহায়তা নিতে পারবেন। অনেক কর অফিসে এখন বিনামূল্যে রিটার্ন পূরণে
সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রশ্ন ৬ঃ পরিবারের সবার জন্য কি একই অ্যাকাউন্ট থেকে রিটার্ন দেওয়া যাবে?
উঃ সোজা ভাষায় না, প্রত্যেক করদাতার নিজস্ব TIN এবং আলাদা অ্যাকাউন্ট থেকে
রিটার্ন দাখিল করতে হবে। একজনের একাউন্ট থেকে অন্যজনের রিটার্ন দেওয়া যায়
না।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম নিয়ে শেষ কথা
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম আসলে খুব একটা জটিল নয়। একটু
মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায় এবং একবার নিজে চেষ্টা করলেই আত্মবিশ্বাস
তৈরি হয়ে যায়। মূল বিষয় হলো– সময় মত প্রস্তুতি নেওয়া, সব তথ্য সঠিকভাবে
দেওয়া এবং নির্ধারিত তারিখের আগেই দাখিল করা। অক্টোবর মাস থেকেই কাগজপত্র
গুছানো শুরু করলে নভেম্বরের ভিড়ে পড়তে হবে না।
কর দেওয়াটাকে অনেকেই বোঝা বলে মনে করেন। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলে বোঝা যায়
আপনার দেওয়া করের টাকায় দেশে রাস্তা তৈরি হয়, স্কুল হাসপাতাল চলে এবং অসংখ্য
মানুষের জীবন একটু সহজ হয়। তাই কর ফাঁকি না দিয়ে সততার সাথে রিটার্ন দাখিল
করুন।
যদি এখনো কোনো বিষয়ে দ্বিধা থাকে তাহলে একজন কর পরামর্শদাতার সাহায্য নিন অথবা
NBR এর হেল্পলাইনে ফোন করুন। এই আর্টিকেলটি পড়ে যদি কোনো প্রকার উপকার হয়ে
থাকে তাহলে আপনার পরিচিতদের সাথেও শেয়ার করুন যাতে তারা ও সহজে রিটার্ন দাখিল
করতে পারে।
ইনফোব্লেন্ড বিডির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url