বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড বর্তমানে অনলাইনে আয় করতে আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এখন অনেকেই চাকরির পাশাপাশি বা নিজের স্বাধীন ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অনলাইন ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন।

বিশেষ করে ড্রপশিপিং এমন একটি ব্যবসা যেখানে নিজেকে পণ্য  মজুদ না রেখেও ব্যবসা পরিচালনা করা যায়। ফলে শুরুতেই বড় অংকের  বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। একজন মানুষ শুধুমাত্র একটি অনলাইন স্টোর তৈরি করে বিদেশি বা স্থানীয় সাপ্লায়ারের পণ্য বিক্রি করতে পারেন এবং অর্ডার পেলেই সেই সাপ্লায়ার সরাসরি কাস্টমারের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়। এতে ব্যবসায় ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে এবং নতুনদের জন্য বর্তমানে এটি সহজ একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পেইজ সূচিপত্রঃ বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড 

বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটার জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করতে ভয় পেত এবং সংকোচ বোধ করত কিন্তু এখন ফেসবুক, ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন ই-কমার্সগুলোর কারণে মানুষের আস্থা অনেকখানি বেড়েছে।এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণ ড্রপশিপিং ব্যবসা শুরু করেছেন। ড্রপ শিপিং এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে গুদাম ভাড়া, পণ্য স্টক বা ডেলিভারি নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না। আপনি মূলত একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। ধরুন আপনি একটি ওয়েবসাইটে মোবাইল এক্সেসরিজ বিক্রি করছেন। একজন কাস্টমার আপনার ওয়েবসাইট থেকে তার পছন্দ অনুযায়ী একটি পণ্য  অর্ডার করলো। এরপর আপনি সেই অর্ডারটি আপনার সাপ্লায়ারের কাছে পাঠালেন। সাপ্লায়ার কাস্টমারের দেওয়া ঠিকানায় পণ্য পৌঁছে দিল। ঠিক  এভাবেই মূলত আপনার লাভ তৈরি হবে। 

বাংলাদেশে অনেকেই এখন, Shopify, WooCommerce কিংবা Facebook Shop ব্যবহার করে ড্রপশিপিং শুরু করছেন। তবে শুধু দোকান খুললেই হবে না, সফল হতে হলে পণ্যের সঠিক নির্বাচন, ভালো মার্কেটিং এবং কাস্টমারের বিশ্বাস অর্জন করা জরুরী। অনেকেই প্রথমদিকে দ্রুত লাভের আশায় ভুল সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ড্রপশিপিং এমন একটি ব্যবসা যেখানে ধৈর্য এবং পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আরও পড়ুনঃ নতুনদের জন্য অনলাইন ব্যবসা শুরু করার গাইড

ড্রপশিপিং কি এবং এটি কিভাবে কাজ করে 

ড্রপ শিপিং হলো এমন একটি ব্যবসায়িক পদ্ধতি যেখানে বিক্রেতা নিজে পণ্য সংরক্ষণ করেন না। একজন কাস্টমার যখন অর্ডার করেন তখন বিক্রেতা সেই অর্ডার সাপ্লায়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর সাপ্লায়ার সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠিয়ে দেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় বিক্রেতার কাজ হলো অর্ডার সংগ্রহ করে এবং কাস্টমারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। 

এই ব্যবসায় সাধারণত তিনটি পক্ষ জড়িত থাকেঃ

  1. বিক্রেতা বা স্টোর মালিক 
  2. সাপ্লায়ার 
  3. কাস্টমার 

ধরুন আপনি একটি অনলাইন স্টোর খুললেন যেখানে টি-শার্ট বিক্রি করছেন।আপনার সাপ্লায়ার এর কাছে একটি টি-শার্টের দাম ৫০০ টাকা। আপনি সেটি ৮৫০ টাকায় বিক্রি করলেন। একজন কাস্টমার অর্ডার দিলে আপনি সাপ্লায়ারকে ৫০০ টাকা দিলেন এবং বাকি ৩৫০ টাকা আপনার লাভ হিসেবে থাকলো। 

এই ব্যবসার সবচেয়ে ভালো দিক হলো শুরুতেই খুব  বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না। অনেক শিক্ষার্থী বা চাকরিজীবীরাও পার্ট-টাইম হিসেবে এটি শুরু করতে পারেন। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে এখানে কাস্টমার সার্ভিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পণ্য দেরিতে পৌঁছালে বা খারাপ মানের হলে কাস্টমার প্রথমেই আপনার ওপরে রাগ করবেন। তাই ভালো সাপ্লায়ার নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশে ড্রপশিপিংয়ের সম্ভাবনা ও বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড বুঝতে হলে প্রথমে দেশের বাজার সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটক এর মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নতুন পণ্য সম্পর্কে জানতে পারছে।ফলে অনলাইন ব্যবসার সুযোগ দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষ করে ফ্যাশন, গ্যাজেট, কসমেটিক্স এবং কিচেন প্রোডাক্ট এর চাহিদা অনেক বেশি। অনেক উদ্যোক্তা এখন বিদেশি সাপ্লায়ার যেমন AliExpress, Alibaba কিংবা  CJ Dropshipping থেকে পণ্য নিয়ে ব্যবসা করছেন। আবার কেউ কেউ স্থানীয় পাইকারি মার্কেটের সাথেও কাজ করছেন।

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং এর আরো কিছু সম্ভাবনার কারণ রয়েছেঃ

  • স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি 
  • অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নতি 
  • ফেসবুক মার্কেটিং এর সহজলভ্যতা
  • কম খরচে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ 
  • তরুণ উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমনঃ

  • আন্তর্জাতিক ডেলিভারিতে সময় বেশি লাগা
  • অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমারের অবিশ্বাস
  • পেমেন্ট গেটওয়েজনিত সমস্যা
  • খারাপ সাপ্লায়ারের কারণে ব্যবসার ক্ষতি 

এসব সমস্যার মাঝেও সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে ড্রপ শিপিং থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।

সঠিক নিশ এবং পণ্য নির্বাচন করার কৌশল 

ড্রপশিপিং ব্যবসায় সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো সঠিক নিশ নির্বাচন করা। নিশ বলতে সাধারণত  নির্দিষ্ট একটি ক্যাটাগরি বা বিষয়কে বোঝায়।আপনি যদি ব্যবসার প্রথমদিকেই সব ধরনের পণ্য বিক্রি করতে যান,তাহলে সফল হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। বরং নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের ওপর প্রথমদিকে টার্গেট করবেন।এতে করে  কাস্টমারের আস্থা তৈরি হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়ঃ

  • শুধুমাত্র নারীদের ফ্যাশন সংক্রান্ত পণ্য
  • মোবাইল গ্যাজেট 
  • রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস 
  • পোষা প্রাণীর পণ্য 
  • বেবি কেয়ার প্রোডাক্ট 

নিশ নির্বাচন করার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকারঃ

১. বাজারে চাহিদা আছে কিনা– যে পণ্যের চাহিদা বেশি, সেই পণ্য বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। Google Trends বা Facebook Ads Library দেখে জনপ্রিয় পণ্যের ধারণা নেয়া যায়।

২. লাভের পরিমাণ কেমন– খুব কম লাভের পণ্য নিয়ে কাজ করলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে যাবে।তাই এমন পণ্য বেছে নিতে হবে যেখানে অন্তত ভালো মার্জিন থাকে।

৩. প্রতিযোগিতা কেমন– অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে নতুনদের জন্য টিকে থাকা কঠিন।এক্ষেত্রে  মাঝারি প্রতিযোগিতার নিশ উপযোগী এবং কার্যকর। 

৪.পণ্যের  সমস্যা কম কিনা– সহজে ভেঙে যায় বা রিটার্ন বেশি হয় এমন পণ্য এড়িয়ে চলা ভালো। এমন জাতীয় পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করলে কাস্টমাররা বিরক্ত বোধ করে এবং শুরুতেই খারাপ অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।

এমন অনেক নতুন উদ্যোক্তা আছেন যারা কিনা ট্রেন্ডিং পণ্যকে টার্গেট করে কাজ করায়  দ্রুত সফল হয়েছেন। যেমন এলইডি লাইট, স্মার্ট ওয়াচ বা কিচেন গেজেট। তবে আবার শুধুমাত্র ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে দীর্ঘ মেয়াদে বিক্রি হবে এমন পণ্য নির্বাচন করাও বুদ্ধিমানের কাজ। 

ওয়েবসাইট তৈরি ও অনলাইন স্টোর সেটআপ

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড অনুসরণ করতে গেলে একটি পেশাদার ওয়েবসাইট তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনার ওয়েবসাইটই হবে কাস্টমারের কাছে আপনার শপ বা দোকান। ওয়েবসাইট সুন্দর এবং বিশ্বাসযোগ্য না হলে মানুষ সহজে অর্ডার করতে চাইবে না।

এজন্য ওয়েবসাইটের সৌন্দর্যের দিকে ফোকাস দিতে হবে এবং গৃহীত নিশের সাথে মিল রেখে সেইরকম থিম ওয়েবসাইটে ব্যবহার করতে হবে। এতে করে কাস্টমারের ওয়েবসাইটের প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি হবে।

বর্তমানে ড্রপশিপিংয়ের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি প্লাটফর্ম হলোঃ Shopify & WooCommerce

Shopify এর সুবিধা 

Shopify ব্যবহার করা অনেক সহজ এবং  নিরাপদ।নতুনরাও খুব দ্রুত  স্টোর তৈরি করতে পারেন। বিভিন্ন থিম এবং অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই সুন্দর ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়। 

WooCommerce এর সুবিধা 

যাদের Wordpress সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে তাদের জন্য WooCommerce অনেক ভালো এবং সহায়ক। এটি তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহার করা যায় এবং কাস্টমাইজেশনের সুযোগ অনেক বেশি থাকে। 

ওয়েবসাইট তৈরি করার সময় যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবেঃ

  • মোবাইল ফ্রেন্ডলি ডিজাইন 
  • দ্রুত লোড হওয়ার ক্ষমতা
  • প্রোডাক্টের পরিষ্কার ও স্পষ্ট ছবি 
  • সহজ চেক আউট সিস্টেম 
  • কাস্টমার রিভিউ সেকশন 
  • যোগাযোগের সকল তথ্য 

একটি সাধারণ ভুল হল অনেক বেশি ডিজাইন বা অপ্রয়োজনীয় জিনিস যোগ করা। এতে করে যেটা হবে ওয়েবসাইট অনেক স্লো বা ধীর গতিতে রান করবে।বরং পরিষ্কার এবং সহজ ডিজাইন রাখলে কাস্টমারের নজরও কাড়ে আবার ওয়েবসাইট দ্রুত লোডও নিতে পারে। 

আরও পড়ুনঃ Shopify দিয়ে ড্রপশিপিং ওয়েবসাইট তৈরির নিয়ম

ভালো সাপ্লায়ার খুঁজে বের করার উপায় 

ড্রপশিপিং ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো সাপ্লাইয়ার নির্বাচন।কারণ আপনার ব্যবসার সুনাম অনেকটাই নির্ভর করবে সাপ্লায়ের সার্ভিসের ওপর। যদি তারা দেরিতে পণ্য পাঠায় বা  নিম্নমানের পণ্য ডেলিভার করে তাহলে আপনার কাস্টমার হারানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

বর্তমানে জনপ্রিয় কিছু ড্রপশিপিং সাপ্লায়ার হলোঃ

  1. Ali Express 
  2. CJ Dropshipping 
  3. Zendrop
  4. Alibaba
  5. Spocket

সাপ্লায়ার নির্বাচন করার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবেঃ

দ্রুত ডেলিভারি– কাস্টমার সব সময় দ্রুত তার অর্ডার করা পণ্যটি হাতে পেতে চান। তাই চেষ্টা করবেন যেসব সাপ্লায়ারের শিপিং সময় কম  থাকে তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়ার।

ভালো রিভিউ– অন্যান্য বিক্রেতাদের রিভিউ দেখে ধারণা নেওয়া যায় সাপ্লায়ার কতটা নির্ভরযোগ্য। যারা টপ রেটেড তাদেরকে শর্ট লিস্টের আওতায় আনুন। শর্ট লিস্টের মধ্যে এমন সাপ্লায়ার পাবেন-ই যাদের সার্ভিস অন্যান্যদের তুলনায় অনেক ভালো।

পণ্যের মান– নিজে আগে একটি নমুনা অর্ডার করবেন এবং দেখার চেষ্টা করবেন তারা কেমন সহানুভূতি প্রকাশ করছে কাস্টমারদের প্রতি। এতে করে আপনি তাদেরকে আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ পাবেন। মনে রাখবেন, পণ্যের মান ভালো তো কাস্টমারের আগমন বাড়বে আর পণ্যের মান খারাপ মানেই কাস্টমার হারাবেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থা– যে সাপ্লায়ার দ্রুত রিপ্লাই দেয় তাদের সঙ্গে কাজ করা সুবিধাজনক। এখন কাজের সময় যদি সাপ্লায়ার অমনোযোগী  থাকে তাহলে কাস্টমারের নিকট আপনাকে অপদস্ত হতে হবে। কাস্টমার আপনাকে এবং আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে  খারাপ বলবে, সাপ্লায়ারকে কিছুই বলবে না। কারণ কাস্টমার ডিল করেছেন আপনার সাথে সাপ্লায়ারের সাথে নয় । সুতরাং যোগাযোগ ব্যবস্থা যার যত বেশি শক্তিশালী তার সাথেই ব্যবসা শুরু করুন।

বাংলাদেশে অনেক উদ্যোক্তা স্থানীয় পাইকারদের সাথেও কাজ করছেন। এতে তারা যে সুবিধা পাচ্ছেন,  ডেলিভারী দ্রুত হচ্ছে এবং কাস্টমারের সন্তুষ্টিও বাড়ছে। স্থানীয় পাইকারদের সাথে কাজ করলে যে আপনার উন্নতি হবে না এমনটা নয়। মেইন কথা হচ্ছে টেকনিক বা কৌশল প্রয়োগ। লোকাল হোক আর ইন্টারন্যাশনাল হোক উভয় মার্কেটেয় টিকে থাকতে বা ভালো রেজাল্ট আনতে প্রয়োজন টেকনিক বা কৌশলের যথার্থ প্রয়োগ।

ড্রপশিপিং ব্যবসায় মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব 

শুধু ওয়েবসাইট তৈরি করলেই যে পণ্য বিক্রি হবে বিষয়টা মোটেই এমন নয়। মানুষকে আপনার পণ্য সম্পর্কে জানাতে হবে। আর এই কাজটাই করে মার্কেটিং। বর্তমানে ড্রপশিপিং ব্যবসার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ডিজিটাল মার্কেটিং। 

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম হলো ফেসবুক। কারণ এখানে কম খরচে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। এছাড়াও Instagram, Tiktok এবং Youtube ব্যবহার করেও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। 

Facebook Ads– ফেসবুকে বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট বয়স, এলাকা বা আগ্রহ অনুযায়ী কাস্টমারকে টার্গেট করা যায়। অর্থাৎ আপনার পণ্য অনুযায়ী আগ্রহী কাস্টমারকে ফেসবুকের মাধ্যমে টার্গেট করতে পারবেন খুব সহজেই। কারণ ফেইসবুক অ্যালগরিদম খুব সহজেই কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বা সার্ভিস কাস্টমারের নিকট পৌঁছে দিতে পারে।

ভিডিও মার্কেটিং

ভিডিও কনটেন্ট বর্তমানে অনেক বেশি কার্যকর। বিশেষ করে কম সময়ের ভিডিও অর্থাৎ  ১৫ সেকেন্ডের মতো ভিডিওতে আপনি যদি আপনার পণ্য বা সার্ভিস সম্পর্কে কাস্টমারকে বোঝাতে পারেন তাহলে আপনার সেল সহজেই বাড়বে। ছোট ভিডিওতে পণ্যের ব্যবহার দেখালে মানুষ দ্রুত আগ্রহী হয়। 

ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং 

অনেক ছোট ইনফ্লুয়েন্সারের সাহায্যে কম খরচে ভালো প্রচার পাওয়া যায়। ব্যবসার প্রথমদিকে যেহেতু পুঁজি কম থাকে এজন্য ছোট ইনফ্লুয়েঞ্জারের মাধ্যমে আপনার পণ্য রিভিউ করে সেটি প্রচার করলে ধীরে ধীরে কাস্টমার আসবে। এরপর ব্যবসায় যদি উন্নতি আসে তাহলে বড় ইনফ্লুয়েন্সার দিয়ে আপনার  পণ্যের রিভিউ করাবেন। বড় ইনফ্লুয়েন্সার মানেই বড় নেটওয়ার্ক। এজন্য স্বল্প পুঁজিতে প্রথমে ছোট ইনফ্লুয়েন্সারের সহায়তা নিন এবং পরবর্তীতে পুঁজির ক্ষমতা বাড়লে বড় ইনফ্লুয়েঞ্জারের সার্পোট নিন।

SEO এর গুরুত্ব

ওয়েবসাইটে SEO করলে গুগল থেকেও ফ্রি ভিজিটর পাওয়া যায়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে বিজ্ঞাপনের খরচ কমে যায়। সঠিকভাবে গুগলের বিধি নিষেধ মেনে SEO করলে ওয়েবসাইটের গুরুত্ব গুগলের কাছেও অনেক বেড়ে যায়। 

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং থেকে আয় করার উপায় নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ  এখান থেকে দ্রুত কাস্টমার পাওয়া যায়। 

একটি বাস্তব উদাহরণ হলো, অনেক উদ্যোক্তা শুধুমাত্র টিকটক ভিডিও ব্যবহার করে হাজার হাজার টাকার বিক্রি করছেন। তাই সৃজনশীল মার্কেটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আরও পড়ুনঃ ফেসবুক মার্কেটিং করে অনলাইন বিক্রি বাড়ানোর উপায় 

পেমেন্ট গেটওয়ে ও ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড সফলভাবে অনুসরণ করতে গেলে পেমেন্ট এবং ডেলিভারি সিস্টেম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ একজন কাস্টমার যদি সহজে পেমেন্ট করতে না পারেন তাহলে তিনি অর্ডার সম্পন্ন করতে পারবেন না। 

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিছু পেমেন্ট মাধ্যমগুলো হলোঃ

  1. বিকাশ
  2. নগদ
  3. রকেট
  4. SSL Commerz
  5. ব্যাংক কার্ড

অনেক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম Paypal সাপোর্ট না করাই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কিছুটা সমস্যাই পড়েন। তবে বর্তমানে অনেক বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা রয়েছে।যেগুলো ব্যবহার করে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তারা তাদের পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত  করে থাকেন। 

ডেলিভারির ক্ষেত্রেঃ

  1. পাঠাও কুরিয়ার 
  2. রেড এক্স
  3. স্টিডফাস্ট
  4. সুন্দরবন কুরিয়ার 
  5. এস এ পরিবরহন

এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে যায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরযোগ্য এবং অধিকতর  নিরাপদ। 

যদি আন্তর্জাতিক ড্রপশিপিং করেন,তাহলে শিপিং সময় সম্পর্কে কাস্টমার কে আগে থেকেই জানানো উচিত।কারণ অনেক সময় বিদেশ থেকে পণ্য আসতে ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বা অনেকসময় লেগেই যায়।

কাস্টমারের সাথে পরিষ্কার যোগাযোগ রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টমার কর্তৃক পণ্য অর্ডার করার পর থেকে নিয়মিত তার ডেলিভারি সম্পর্কে তাকে আপডেট দিতে থাকুন, এতে কাস্টমারের বিশ্বাস বাড়বে। অর্থাৎ   অর্ডার কনফার্মেশন, ট্রেকিং তথ্য এবং ডেলিভারি আপডেট দিলে কাস্টমারের আস্থা বাড়ে। 

নতুন উদ্যোক্তাদের সাধারণ ভুল এবং সমাধান 

অনেকেই ড্রপশিপিং শুরু করেন অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিন্তু কয়েক মাস পর হতাশ হয়ে তা বন্ধ করে দেন। এর মূল কারণ হলো কিছু সাধারন ভুল।

যদি শুরু থেকেই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা যায় তাহলে সফল হবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। 

১. দ্রুত ধনী হওয়ার চিন্তা 

অনেকেই মনে করেন ড্রপশিপিং শুরু করলেই দ্রুত লাখ টাকা আয় হবে। বাস্তবে এটি একটি ব্যবসা এবং এখানে সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন। সময়, পরিশ্রম এবং কঠোর অধ্যবসায় ব্যতীত আপনি কখনোই সফল হতে পারবেন না। সুতরাং ধৈর্য ধরুন, চেষ্টা চালিয়ে যান সফলতা একদিন আসবেই। ড্রপশিপিং ব্যবসা করে আজ যারা ভালো অবস্থানে গিয়েছেন তারাও একসময় হতাশ হয়েছে কিন্তু হাল ছাড়ননি। আর এই কারণে একটা সময়  তারা সফল হয়েছেন।

২. ভুল পণ্য নির্বাচন 

অধিকাংশ উদ্যোক্তরাই নিশ নির্বাচনে ভুল করে থাকেন। তারা প্রথমেই যে ভুলটি করেন যে পণ্যটি মানুষের নিকট তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং উক্ত পণ্য সহজলভ্য সেইসকল পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। এমনটা করলে তো চলবে না। যে পণ্য মানুষ কোথাও না খুঁজে পেয়ে অনলাইনে এসেছে খোঁজ করতে, সেই সকল পণ্যকে টার্গেট করুন। একজন ব্যক্তি অনলাইনে পণ্য খোঁজ করতে এসেছেন মানেই শতভাগ নিশ্চিত যে সে এটা ক্রয় করবেন। এইজন্য পণ্য নির্বাচনের পূর্বে সময় নিয়ে বেশি বেশি রিচার্চ করুন, যে পণ্যটা সকল কন্ডিশনকে ফুলফিল করবে কেবল সেটাকেই টার্গেট করুন। 

৩. খারাপ সাপ্লায়ার নির্বাচন

খারাপ মানের পণ্য পুরো ব্যবসাকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে সক্ষম। এজন্য খারাপ মানের পণ্য সাপ্লাই দিয়ে থাকে এমন সকল সাপ্লায়ার থেকে বিরত থাকুন। সারা বিশ্বে অনেক ভালো ভালো সাপ্লায়ার আছে যারা বিশ্বস্ত, তাদের সাথে যোগাযোগ করুন তারা আপনাকে সহায়তা করবে। 

৪. মার্কেটিং না বোঝা

শুধু স্টোর তৈরি করলেই হবে না সঠিকভাবে বিজ্ঞাপন চালাতে জানতে হবে। সঠিকভাবে যদি বিজ্ঞাপনে চালানো না হয় তাহলে বিক্রিও বাড়বে না। বিক্রি বাড়াতে হলে মার্কেটিং এর কোন বিকল্প নেই। মার্কেটিং সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যারা মার্কেটিং নিয়ে কাজ করে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আবার ইউটিউবে এই রিলেটেট অনেক ভিডিও আছে সেগুলো দেখুন এবং শিখুন।

৫. কাস্টমার সার্ভিস অবহেলা করা 

কাস্টমারের প্রশ্নের উত্তর দেরিতে দিলে বা সমস্যার সমাধান দ্রুত না দিতে পারলে ব্যবসার  সুনাম নষ্ট হয়। সব সময় চেষ্টা করবেন দ্রুত কাস্টমারের সেবা নিশ্চিত করার। কাস্টমার কি জানতে চাচ্ছে, কোন বিষয়ে জানতে চাচ্ছে, কোন বিষয়টা জানলে সে উপকৃত হবে এই জাতীয় সকল প্রশ্নের জবাব অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করুন। কাস্টমার সার্ভিসে অবহেলা করবেন তো সেল কমে যাবে এবং প্রতিষ্ঠানের নাম ক্ষুন্ন  হবে। 

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং থেকে আয় করার উপায় নিয়ে সফল উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায় তারা ধৈর্য ধরে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। কেউই একদিনে সফল হননি। 

তাই নতুনদের উচিত ছোটভাবে শুরু করা,অভিজ্ঞতা অর্জন  করা এবং ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় করা। 

ড্রপশিপিং ব্যবসা সফল করার বাস্তব কৌশল

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড শুধু পড়ে রাখলেই হবে না, বাস্তবে সঠিক কৌশলও প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে তাই অন্যদের থেকে আলাদা কিছু করতে না পারলে সফল হওয়া কঠিন। 

নিচে কিছু কার্যকর কৌশল দেওয়া হলোঃ

নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড তৈরি করুন– শুধু পণ্য বিক্রি না করে নিজের ব্রান্ড তৈরি করার চেষ্টা করুন। সুন্দর লোগো, ভালো প্যাকেজিং এবং প্রফেশনাল আচরণ কাস্টমারের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করুন এবং আপলোড দিন– ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও এবং ব্লক কনটেন্ট নিয়মিত প্রকাশ করলে মানুষ আপনার পেজ সম্পর্কে জানতে পারে। 

নিয়মিত কাস্টমারের মতামত নিন– কাস্টমারের থেকে রিভিউ এবং ফিডব্যাক সংগ্রহ করলে ব্যবসা উন্নত করা সহজ হয়।

ছোট বাজেটে পরীক্ষা করুন– শুরুতেই বড় বাজেটে বিজ্ঞাপন না চালিয়ে ছোট বাজেটে বিভিন্ন পণ্য পরীক্ষা করে দেখতে থাকুন । যেটি ভালো ফল দিবে সেটিতে বেশি বিনিয়োগ করুন। 

ইমেইল মার্কেটিং ব্যবহার করুন– অনেকেই এই অংশটি অবহেলা করেন। কিন্তু পুরনো কাস্টমারদের কাছে নতুন অফার পাঠালে পুনরায় বিক্রি হবার সম্ভাবনা বাড়ে। 

ট্রেন্ড অনুসরণ করুন– বর্তমানে কোন পণ্যটি জনপ্রিয় হচ্ছে সেদিকে নজর রাখুন। সময়ের সাথে পরিবর্তন আনতে পারলে ব্যবসা টিকে থাকবে। 

বাংলাদেশে অনেক তরুণ এখন ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক মার্কেটে কাজ করছেন। কেউ কেউ শুধুমাত্র একটি সফল পণ্যের মাধ্যমে মাসে ভালো আয় করছেন। তবে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম এবং শেখার মানসিকতা। 

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড নিয়ে আমার শেষ কথা 

বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পথ দেখাতে পারে। বর্তমানে কম খরচে অনলাইন ব্যবসা শুরু করার সুযোগ খুব বেশি নেই কিন্তু ড্রপ শিপিং সেই সুযোগটি তৈরি করেছে। এখানে শুরুতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন না থাকলেও সফল হতে হলে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক মার্কেটিং জানতে হবে।

ভালো সাপ্লায়ার নির্বাচন, কাস্টমারের আস্থা অর্জন এবং নিয়মিত শেখার মানসিকতা থাকলে এই ব্যবসা থেকে দীর্ঘ মেয়াদে ভালো আয় করা সম্ভব। অনেকেই প্রথমদিকে ছোটভাবে শুরু করেও পরবর্তীতে বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। তাই হঠাৎ বড় লাভের চিন্তা না করে ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যদি আপনি সঠিকভাবে কাজ করেন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেন তাহলে ড্রপশিপিং ভবিষ্যতে আপনার জন্য একটি সফল অনলাইন ক্যারিয়ার হয়ে উঠতে পারে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইনফোব্লেন্ড বিডির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url